রাস্তায় একটা গরুর বাছুর একা একা হাঁটছে আর এদিক সেদিক ছুটা-ছুটি করছে।
বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঢেকরতলা মোড়ের কাছে এই দৃশ্য দেখল স্থানীয় কয়েকজন শিশু-কিশোর। একটু আগেই একটা ব্যাটারিচালিত রিকশা এই দুই-তিন মাসের এঁড়ে বাছুরটি রাস্তায় ফেলে দ্রুত চলে গিয়েছিল। কারা ছিল রিকশায়, কোথা থেকে এসেছিল — কিছুই জানা নেই। তবে বাছুরটি যে চুরি হয়েছিল, সেটা পরে স্পষ্ট হয়।
শিশু-কিশোরদের দল বাছুরটি তুলে নিয়ে গেল পাশেই কাচারী কোয়ালীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে। চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বাছুরটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিলেন। গ্রাম পুলিশের এক সদস্যকে দেখভালের দায়িত্ব দিলেন। আর মালিক খোঁজার জন্য এলাকায় মাইকিং শুরু হলো।
মালিক এলেন, কিন্তু প্রমাণ?
বেলা আড়াইটার দিকে পাশের বাসুপাড়া ইউনিয়নের বীরকয়া গ্রাম থেকে আকরাম হোসেন ছুটে এলেন। দাবি করলেন, বাছুরটি তাঁর। দুপুর থেকে মাঠে গাভি ও বাছুর ছিল, কখন হারাল বুঝতেই পারেননি।
কিন্তু দাবি করলেই তো হয় না। যে কেউ এসে বলতে পারে এটা আমার। চেয়ারম্যান তাই একটাই শর্ত রাখলেন — গাভিটাকে নিয়ে আসুন।
সহজ পরীক্ষা। কিন্তু এর চেয়ে নিখুঁত প্রমাণ আর কী হতে পারে?
দৌড়ে গেল মায়ের কাছে
বেলা তিনটার দিকে আকরাম গাভিটি নিয়ে পরিষদ চত্বরে ঢুকলেন। গাভি দেখামাত্র বাছুরটি উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ডাকাডাকি শুরু করল। তারপর দৌড় দিল সরাসরি। গিয়ে মায়ের কাছে মুখ গুঁজে দুধ খেতে লেগে গেল।
এরপর আর কোনো প্রশ্ন ছিল না। বাছুর আকরাম হোসেনের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
প্রথম আলোকে আকরাম হোসেন বললেন, গাভি ও বাছুর মাঠে ছিল। দুপুর থেকে বাছুর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। লোকজনের মাধ্যমে মাইকের খবর জানতে পেরে ছুটে এসেছিলেন। যাচাই হওয়ার পর বাছুরটি ফেরত পেয়েছেন।
চুরির ঘটনা, তদন্ত চলছে
বাগমারা থানার ওসি জিল্লুর রহমান ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বলেছেন, বাছুরের মালিককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রকৃত মালিক পাওয়া গেছে, তিনি বাছুর নিয়ে গেছেন।
রিকশায় থাকা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তারা কারা, কোথা থেকে বাছুরটি নিয়েছিল — এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
মাঠপর্যায়ে বিচারের একটি গল্প
এই ঘটনার একটা দিক আছে যেটা শুধু চুরির খবর হিসেবে পড়লে বোঝা যায় না।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পশু চুরি নতুন কিছু নয়। গরু, ছাগল, মুরগি চুরির ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মালিক প্রমাণ দিতে পারেন না। কাগজপত্র নেই, সাক্ষী নেই।
এই ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একটা সহজ কিন্তু বুদ্ধিমানের পথ বেছে নিলেন। কোনো আদালত নয়, কোনো দলিল নয়। শুধু গাভিকে ডাকলেন। বাছুর নিজেই সব বলে দিল।
গাভি আর বাছুরের সম্পর্ক ভুলের নয়। মায়ের গন্ধ বাছুর ভোলে না। এই প্রকৃতির সাক্ষ্য কোনো মিথ্যা নথি দিয়ে বদলানো যায় না।
বাগমারার ঢেকরতলা মোড়ে সেই বুধবার দুপুরে যে শিশুরা রাস্তায় পড়ে থাকা বাছুরটি তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তারা হয়তো বুঝতে পারেনি তারা কী করছে। কিন্তু তাদের ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই শেষ পর্যন্ত একটা পরিবারের গরু ফিরিয়ে দিল।